মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
পাতা

ভাষা ও সংষ্কৃতি

হাটহাজারীর লোকাচার :

হাটহাজারী মানুষের আদি সংস্কৃতি ও লোকাচার চট্টগ্রামের অন্যান্য অঞ্চল থেকে কিছুটা ব্যবধান আছে। হাটহাজারী পশ্চিম সীমান্তে চন্দ্রনাথ পাহাড় শ্রেণী উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত। পূর্ব ও উত্তর পার্শ্বে হালদা নদী অববাহিকা মধ্যভাগ আংশিক সমতল। তাই প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে হাটহাজারীর লোকাচার কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান থাকলেও তা সহজে দৃষ্টিগোচর হয় না। পারিবারিক সাংসারিক কাজে মৃৎ শিল্পের ব্যবহার ছিল না তা নয়। সামাজিক অনুষ্ঠানেও মৃৎ শিল্পের ব্যাপক ব্যবহার ১৯৭০ইং পর্যন্ত হাটহাজারী ও চট্টগ্রামের অন্যান্য স্থানেও ছিল। বিয়ে, ওরশ ইত্যাদিতে মাটির তৈরি বাসন-কোসন ব্যবহার হতো। কিন্তু বর্তমানে গৃহস্থলী কাজে মৃৎ শিল্পের ব্যবহার কমে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষের অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বিজ্ঞানের যাত্রাপথের কারণে আমরা হারাচ্ছি প্রাচীন ঐতিহ্য। আজকাল মুসলমান বিয়েতে ছোট ছোট হাঁড়ি ব্যবহার হয় না। আগে হাঁড়ি ভর্তি বাতাসা বরপক্ষ কন্যা পক্ষের দাবী মত গণনা করে দিতে হতো। হাঁড়ি ভর্তি বাতাসাকে মাইনের টুপি বলা হতো। প্রাচীনকালে মুসলমানদের বিবাহ কন্যা পক্ষের কয়েকটি দাবীর মধ্যে মাইনের টুপি একটি প্রধান দাবী। চারিয়া গ্রামের জেবল হোসেন পন্ডিত জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন মৃৎশিল্পী। পুঁথি সাহিত্যের উপর তাঁর প্রচুর জ্ঞান ছিল এবং পুঁথি পাঠের ক্ষেত্রে তাঁর সমসাময়িক প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না।

হাটহাজারীর লোকসাহিত্য ও পথসাহিত্য :

সংবাদপত্র, সাময়িকী সাহিত্যের মতো হাটহাজারীতে লোক সাহিত্য ও পথসাহিত্যের ভূমিকা তেমন কম নয়। হাটহাজারীর লোকসাহিত্য এককালে সমগ্র চট্টগ্রামের বেশ আদরনীয় ছিল। কালের করাল গ্রাসে সবকিছু আজ হারিয়ে গেছে। হাটহাজারীকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিল ছড়া :

বাঁচা কাঁদে হাজারী হাডৎ বই,

বাঁচার মামু আইয়্যেদ্দে মিডাইর পাইল্যা লই,

বাঁচা কাঁদে লম্বা পথৎ বই

বাঁচার মামু আইয়্যেদ্দে দইয়র হাড়ি লই।।

হাটহাজারীকে “হাটাহাজারী হাড” বলে। এককালে হাটহাজারী মিষ্টির জন্য উত্তর চট্টগ্রামে খুবই বিখ্যাত ছিল। বাঁচা অর্থে ছোট শিশুকে বোঝায়। শিশু কাঁদলে কান্না বন্ধ করার জন্য হাটহাজারীর মিষ্টির কথা বললে শিশু কাঁদা বন্ধ করত।

হাটহাজারীর প্রাচীন সামাজিক সংস্কৃতি :

প্রাচীনকালে হাটহাজারীতে পারিবারিক ও সামাজিক বহু ধরনের সংস্কৃতির প্রচলন ছিল। একটি শিশু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা স্তরে নানান জাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে পারিবারিক ও সামাজিক জীবন আনন্দঘন পরিবেশে কাটাত। ধর্মীয় বিধি-বিধান অনুসরণে মোল্লা-মিয়াজী বা মির্জিগণ নিজ নিজ এলাকার নবজাতকের নাম রাখা, দোয়া দরুদ পাঠে জীন-পরীর আসর থেকে বাঁচার জন্য তাবিজ কালাম লিখে দেন। নানী-দাদীরা নাতিকে দোলনায় চড়ান। মুড়ি, খই, চাউল, শিম ভাজা খাওয়ানো নানান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পারিবারিক সংস্কৃতি বজায় রাখেন। দোলনায় চড়ানো অনুষ্ঠানে নানার বাড়ীর থেকে দোলনা, বালিশ ইত্যাদি প্রদান করা হয়। এতে নানী-দাদীরা নাচ-গান ও অলা সুর ধরে গাইতেন।

(ক)     অ-বাচা, ন-কাঁদিও না ভাঙ্গিও গলা

          কাইল ফজরে আনি দিয়ম চক বাজাইজ্যা লোলা।

(খ)     দমকল দমকল বানিয়া

          বৌ আইন্নুম যে কালিয়া

          বউর নাম সুরতি কন কন যাইবা বইরাতি।

(গ)     অ-বাঁচা ন-কাঁদিও মাইনষে হুনিব

          তোর মামু আইলে বাঁচা বচ্চু কিনি দিব।

আজকাল সেই প্রাচীন ধর্মীয়, আচার-আচারণ কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। রাজা-বাদশার কাহিনী, ভাইংগা কিচ্ছা, ছড়া পাঠ লোকগীতি ও লোকসাহিত্যের কথা একজনে বলত অপর জনেরা মনোযোগ দিয়ে শুনত। কিন্তু আধুনিক যুগে এইসব হারিয়ে লোকসাহিত্যের লুপ্ত হতে থাকে।

হাটহাজারীর নাট্য চর্চা :

১৯৪০ সনেই প্রতিষ্ঠিত হয় হাটহাজারীর ফতেপুর ডায়মন্ড ক্লাব। হাটহাজারীর পল্লী এলাকায় নাটক ও যাত্রাভিনয় স্বদেশী আন্দোলনের সময় খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। অভিনয়ের সাথে সাথে ইংরেজ বিরোধী মনোভাব প্রকাশ পেত। এই ক্লাবের মূল লক্ষ্য ছিল ইংরেজদের বিরুদ্ধে সাধারন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে একত্র করে সংগ্রাম মুখর করা। এই ক্লাব গঠনের জন্য শুধু ফতেপুর ইউনিয়নের নহে ফতেয়াবাদ, মাদার্শা ও মেখল গ্রামের সচেতন মানুষ নাট্য চর্চার মাধ্যমে শুরু করে তাদের কর্ম তৎপরতা। ১৯৪৭ সনের ১৪ই আগস্ট তারিখ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর মাত্র কিছুদিন স্থিমিত ছিল হাটহাজারীর নাট্য চর্চা। ষাটের দশকে আবার প্রতিষ্ঠিত হয় আলাউল ক্লাব। এই ক্লাবের উদ্দেশ্য গ্রামের সাধারন মানুষের নিকট অভিনয়ের মাধ্যমে জাতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশ সাধন করা। প্রায় নাটক মদনহাটের বাজারে, ইছু সাবের ভিটায় কিংবা ফতেপুর লতিফ পাড়া প্রাইমারী স্কুলের মাঠেই মঞ্চস্থ করা হতো।

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে হাটহাজারী :

শিক্ষা সংস্কৃতিতে আবহমান কাল থেকে যেমন হাটহাজারী সমৃদ্ধ ঠিক তেমনি খেলাধুলায়ও এই উপজেলার একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। দেশজ খেলাধুলার পরিবর্তে ভিনদেশী খেলা এখন আমাদের সন্তানদের কাছে অতি প্রিয়। লালন, হাছান, সুকন্দ দাসের গান এখন আর যেমন শোনা যায় না তেমনি চোখে পড়ে না হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা, কানামাছি খেলা। একসময় গাঁ-গ্রামে বলি খেলা নিয়ে কতনা মাতামাতি, নাচানাচি হতো, এক গাঁয়ের বলির সাথে অন্য গাঁয়ের বলির খেলা শুধু খেলা ছিল না, ছিল দু’গাঁয়ের মান-ইজ্জতের বিষয়। হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা, কানামাছি, বাঘবন্ধী, লাঠি খেলা কিংবা সাঁতার, নৌকা বাইচ, গোল্লাছুট, ডাংগুলি, মোরগ লড়াই, ঘুঁড়ি উড়ানো, কবুতর খেলা এসবই আমাদের পূর্ব পুরুষের স্মৃতির সাথে জড়ানো। আষাঢ়ের বাদল দিনে গৃহকোণে ষোলগুটি খেলার স্মৃতি আজও অনেক বৃদ্ধের মনে দোলা জাগায় নিঃসন্দেহে। ইংরেজ প্রবর্তিত ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাটমিন্টন খেলার দাপটে আমরা হারিয়ে ফেলছি এইসব সোনালী দিনের জনপ্রিয় খেলাগুলো। সারাদেশে ক্রিকেট খেলার জনপ্রিয়তার সূত্র ধরে হাটহাজারীতে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে ক্রিকেটের আয়োজন শুরু হয়। হাটহাজারীর সর্বত্র তরুণ যুবকেরা এখন ক্রিকেট নিয়ে মাতামাতি করছে।